।।আবুল হোসাইন মাহমুদ ।।
সবুজ পাহাড়ে বেষ্টিত
বিরাট এলাকা। একটি দুটি নয়। বেশ কয়েকটি পাহাড় ঘিরে আছে পুরো জনপদটিকে। লোকজনও কম নয়।
পাহড়ের পাদদেশে সমতল ভূমিতে ওরা চায় করে বিভিন্ন জাতের ফসল। রয়েছে ফলের বাগান। খেজুরের
বাগান। বাগানে ফলের কমতি নেই। গৃহপালিত পশুও অনেক। সবাই সুখী। কারো অভাব নেই। সবার
জমিতেই ভালো ফসল হয়। বৃষ্টি হয় মাঝে মধ্যেই এ ছাড়া অদূরেই রয়েছে পাহাড়ি ঝর্ণা। সব কিছু
মিলিয়ে পরম সুখে দিন কাটছে এ জনপদের লোকদের।
এইসব লোকদেন সম্বন্ধে
আলকোরআনে বলা হয়েছে -
অত্তাকুল্লাজী
আমাদ্দাকুম বিমা তা’লামুন। আমাদ্দাকুম বিআনয়া-মিউ অবানীন। অজান্নাতিউ
অউ’ইউন।
ভয় কর তাঁকে,
যিনি তোমাদেরকে সে সব বস্তু দিয়েছেন যা তোমরা জানো। তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন চতুষ্পদ
জন্তু ও পুত্র সন্তান। আর দিয়েছেন উদ্যান ও ঝর্ণা।
এই জনপদের লোকেরা
ছিল একই জাতি-গোষ্ঠীর। একই গোষ্ঠী এত দিক দিয়ে সম্পদশালী? ব্যাপারটি তাদেরকে অহংকারী
করে তুলে। তাদের সম্পদের অভাব নেই। জনবলের অভাব নেই। নেই গৃহপালিত জীবজন্তুর অভাব।
শুধু তাই নয়। গায়ে গতরেও তারা ছিল শক্তিশালী ও হৃষ্টপুষ্ট। আলকোরআনে তাদের সমৃদ্ধি
ও অহংকারের উল্লেখ রয়েছে এভাবে।
অযকুরু ইজ জাআলাকুম
খুলাফা-আ মিম বা’দি ক্বাওমি নূহ।
স্মরণ কর, আল্লাহ
তায়ালার সেই অনুগ্রহ ও দয়াকে যে, নূহের জাতির পরে তিনি তোমাদেরকে প্রতিনিধি বানালেন।
অযা-দাকুম ফিল
খালকি বাসত্বাহ।
শারীরিক দিক থেকে
তোমাদেরকে তিনি খুবই স্বাস্থ্যাবান ও হৃষ্টপুষ্ট করেছিলেন।
সেইযুগে তারা
ছিল নজীর বিহীন জাতি। তাদের সমকক্ষ অন্য কোন জাতি ছিলো না।
আল্লাতী লাম ইউখ্লাক্
মিছুলুহা ফিল বিলাদ।
তাদের মত অন্য
কোন জাতি দেশে সৃষ্টি করা হয়নি।
হাদীস থেকে জানা
যায়, তাদের একেকজনের শারীরিক উচ্চতা ছিল বার হাত লম্বা।
এই রকম যাদের
দৈহিক গড়ন, তাদের শক্তির কি তোড়-জোড় ছিল তাতো বুঝাই যায়। এইসব লোকের পেশা ছিল কৃষি
ও ব্যবসা। এ দুটো তাদের পেশা হলেও তারা ছিল শিল্পকর্মে সুনিপুণ। তাদের এই শিল্পগুণ
তাদের অহংকারের বস্তু ছিল।
পাহাড়ের ধারে
কাছে তারা নির্মাণ করে বিশাল বিশাল অট্টালিকা। এইসব অট্টালিকার শিল্পগুণ দেখে তখনকার
পৃথিবীর লোকেরা বিস্মিত হতো। এটিই তাদের জন্য কাল হয়েছিল। তারা ঘোষনা করতো, তাদের চেয়ে
শক্তিশালী, পৃথিবীতে আর কেউ নেই। অহংকার আর কাকে বলে।
এই অহংকারী জাতির
নাম আ’দ জাতি। হযরত নূহের সময়কার মহা প্লাবনের পর তাঁর
সন্তান ‘সাম’ এই এলাকার বসবাস শুরু করেন। তাঁর বংশ থেকেই আ’দ নামে একজন প্রতাপশালী ব্যক্তি ছিলো।
আ’দের মত ক্ষমতাবান, শক্তিশালী ব্যক্তি সে যুগে আর ছিল না। তার ছিল অনেক
সন্তান সন্ততি। বিশাল তার জনগোষ্ঠী। তারাও ছিল সবদিক দিয়ে শক্তিশালী।
এই আ’দের নামানুসারে এই জাতির লোকেরা ক্বওমে আ’দ বা আ’দ বংশীয় লোক বলে পরিচিত। আ’দ জাতিকে উরামও বলা হয়। কারণ আ’দের দাদার
নাম ছিল ইরাম। আ’দ ছিল হযরত নূহের পঞ্চম পুরুষের মধ্যে।
কোথায় তাদের আবাস
এই আ’দ জাতি বসবস করতো আরবের ‘আহক্বাফ’ অঞ্চলে। এই অঞ্চলটি ছিল হাযরামাইত এর উত্তরে। এর
পূর্বে ছিল ওমান। আর উত্তর দিকে ছিল রুবউল খালী। কেউ কেউ বলেন আ’দ জাতির বসতি ঞাযরামাউত ও ইয়ামানের পারস্য উপসাগরের তীরে ইরাকের সীমানা
পর্যন্ত বি¯তৃত ছিল। আর ইয়ামান ছিল তাদের রাজধানী।
মূলতঃ আ’দ জাতি হলো আরবের প্রাচীন জাতি। আ’দ জাতির
১৩টি পরিবার ছিল। তাদের প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল গোটা আরব জুড়ে। তাদের ক্ষেত খামার গুলো
ছিল াত্যন্ত সজীব ও শস্যশ্যামল। সব রকমের বাগান ছিল। এক কথায় একটি সভ্যতা মন্ডিত শক্তিশালী
জাতি ছিল তারা। আল্লাহ তায়ালা তাদের সামনে নেয়ামতের দ্বার খুলে দিয়েছিলেন। তারা পাহাড়ের
পাদদেশে সমভুমিতে বিশাল বিশাল অট্টালিকা নির্মাণ করেছিল।
এইসব করতে করতে
এবং খোদার অফুরন্ত নেয়ামত ভোগ করতে করতে, তারা নেয়ামতদাতা এক আল্লাহকে ভুলে যায়। আল্লাহ
তায়ালারও একটি চিরন্তন নিয়ম হচ্ছে, অবাধ্য জাতিকে তিনি ঢিলে দেন। আ’দ জাতিও এই ঢিলে পেয়ে ধনাঢ্যতার চরম সীমায় পৌঁছে দিগবিদিক জ্ঞান হারিয়ে
ফেলেছিল।
আলকোরআনে এদের
সম্পর্কে বলা হয়েছে -
আলাম তারা কাইফা
ফায়ালা রাব্বুকা বিআ’দ, ইরামা জা-তিল ইমাদ।
তুমি কি দেখনি
তোমার প্রভু স্তম্ভের মালিক আ’দে এরামের সাথে কি ব্যবহার করেছেন?
আ’দ জাতির এই বিশাল স্তম্ভের উপর তৈরী উঁচু উঁচু দালান কোঠা ও তাদের দৈহিক
শৌর্যবীর্য তাদেরকে অহংকারী করে তুলেছিল।
আলকোরআনে তাদের
অহংকারের কথা এভাবে এসেছে -
ফাআম্মা আ’দুন, ফাস্তাকবারু ফিল আরদি বিগাইরিল হাক্কি, অক্বালু মান আশাদ্দু মিন্না
কুওয়াহ।
এখন আ’দের কথা। তারা তো পৃথিবীতে সত্যপথ থেকে সরে গিয়ে গর্ব অহংকারের আচরণ
করেছিল এবং বলতে শুরু করেছিল, কে আছে আমাদের চেয়ে শক্তিশালী?
তাদের ক্ষমতা
ছিল কিছু লোকের হাতে কুক্ষিগত। তারা ছিল স্বৈরাচারী। তাদের সামনে কেউ টু শব্দটি করতেও
ভয় পেতো।
অত্তাবাই আমরা
কুল্লি জাব্বা-রিন আনীদ।
এবং সত্যের দুশমন
প্রত্যেক স্বৈরাচারীর হুকুম তারা মেনে চরতো।
এই বিশাল শক্তিশালী
জাতি তাদের বিবেক ও চিন্তা শক্তি হারিয় ফেলেছিল। শয়তান তাদেরকে ভুলপথে নিয়ে গিয়েছিল।
নিজেদের হাতে তৈরী মূর্তিকে তারা নিজেদের খোদা বানিয়ে নিয়েছিল। আ’দ জাতির লোকেরা যেমন স্থাপত্য শিল্পে উন্নত ছিল , তেমনি তারা মূর্তি
নির্মাণের কাজেও অভিজ্ঞ ছিল।
হাদীস থেকে জানা
যায় তাদের একটি মূর্তির নাম ছামুদ ছিল। আরেকটির নাম ছিল হাতার।
এই হলো ক্বওমে
আ’দ। আ’দ জাতি। যাদের ঘটনা আলকোরআনে বারটি সুরায় পনর বার
আলোচিত হয়েছে।

1 comment:
সুন্দর একটি লেখা আমাদের উপহার দেয়ার জন্য মহান আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই আপনাকে পুরস্কৃত করবেন। আরও ভালো ভালো লেখা আমাদের উপহার দিন এমনটাই আশা করছি। ধন্যবাদ!
Post a Comment